মুদ্রাস্ফীতি বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ
মুদ্রাস্ফীতি বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ
মুদ্রাস্ফীতির নানা রকম সংজ্ঞা রয়েছে। কিছু সংজ্ঞা তুলে ধরা হোল। অর্থনীতিবিদ ক্রাউথার বলেন, “মুদ্রাস্ফীতি হোল এমন এক অবস্থা যখন অর্থের মূল্য ক্রমাগত হ্রাস পায় এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। ” অধ্যাপক পিগু বলেন, “যখন আয় সৃষ্টিকারী কাজ অপেক্ষা মানুষের আর্থিক আয় অধিক হারে বৃদ্ধি পায়, তখনই মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়।” অধ্যাপক স্যামুয়েলসন এর মতে, “দ্রব্যসামগ্রী এবং উৎপাদনে উপাদানসমুহের দাম যখন বৃদ্ধি পেতে থাকে, সাধারণ ভাবে তখন তাকে মুদ্রাস্ফীতি বলা হয়। ”
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে বিষদ আলোচনা করা এই লেখার উদ্দেশ্য না। কিছু সংজ্ঞার মাধ্যমে জানা গেল প্রাথমিক ভাবে মুদ্রাস্ফীতি টা আসলে কি। মুদ্রাস্ফীতি সকল দেশে একই রকম আচরন করে না। কখনও কখনও এটা কোন দেশের জন্য আশীর্বাদ নিয়ে আসে। বাংলাদেশের জন্য বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি একটি আশীর্বাদ সরুপ এসেছে। কিন্তু এটা জানার আগে মুদ্রাস্ফীতি হিসেবটি আসলে কিভাবে করে সেটা জেনে নেওয়া যাক।
হোলসেল প্রাইস ইনডেক্স এবং কনসিউমার প্রাইস ইনডেক্স এই দুটো ইনডেক্স দ্বারাই মুলত মুদ্রাস্ফীতি কত হয়েছে সেটা বের করা হয়। বেশির ভাগ দেশ কনসিউমার প্রাইস ইনডেক্স ব্যাবহার করেই এটা বের করে থাকে। বিভিন্ন দেশ তার দেশের কিছু নির্দিষ্ট পণ্য এর মূল্য এর বৃদ্ধি সময়ে সময়ে মনিটর করে থাকে এবং একটি গড় ফলাফল থেকে মুদ্রাস্ফিতির পরিমাপটি করা হয়।
মূল আলোচনায় আসা যাক। বর্তমানে বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফিতির প্রধান কারন জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এবং তেলের দাম বৃদ্ধির সাথে সাথে অনেক গুলো পণ্য এর মূল্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা বাংলাদেশের মানুষ সাধারন ভাবে ২ ধরনের জীবন ব্যবস্থার সাথে জড়িত। একটি হোল শহরের জীবন আরেকটি গ্রামের জীবন। পণ্য এর মধ্যে আমাদের প্রথম যে জিনিসটি আসে তা হোল প্রাত্যহিক জীবনের খাদ্য পণ্য। বাংলাদেশ যেহেতু একটি কৃষি প্রধান দেশ তাই গ্রাম অঞ্চলে প্রায় প্রতিটা ঘরেই নিজেদের খাওয়ার জন্য কিছু না কিছু উৎপাদন হয়েই থাকে। এটা কনসিউমার প্রাইস ইনডেক্স এর মধ্যে আসে না এবং বাংলাদেশের গ্রাম অঞ্চলের মানুষ যে খাদ্য পণ্য বাজার থেকে কিনে থাকে তা হোলসেল প্রাইস ইনডেক্স এর আওতায় পরে। কারন তারা শহরের মানুষের তুলনায় অনেক কম দামেই পণ্য কিনতে পারে। এই ক্ষেত্রে মুদ্রাস্ফিতির কারনে গ্রামের মানুষ শহরে তাদের পণ্য বিক্রি করে আগের চেয়ে বেশি লাভবান হয়ে থাকে। পণ্য বিক্রি করতে আগের চেয়ে খরচ বেশি হলেও লাভের পরিমান ফিক্সড % থাকার কারনে তাদের আগের চেয়ে বেশি লাভ হয়েই থাকে। যে সব কোম্পানি গুলো বড় আকারে এগ্রো বিজনেস করে থাকে তাদেরও তেমন কোন সমস্যা হয় না কারন তাদের জন্য যে শ্রমিক লাগে তারাও গ্রাম অঞ্চলেই থাকে। কিছুটা বেতন বৃদ্ধির মাধ্যমেই মুদ্রাস্ফিতির সমস্যাটি দূর করে দেওয়া হয়।
এখন কথা হোল শহরের মানুষ তাহলে কিভাবে লাভবান হয়, তারা তো বেশি দাম দিয়েই কিনছে। মুদ্রাস্ফিতির সময় শহরের মানুষ তাদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে। যেমন মানুষ খুব কম রেস্টুরেন্ট যায়, বাইরের যেকোনো খাবার কম কেনার চেষ্টা করে, কিছু বদভ্যাস জনিত খরচ কমিয়ে দেয় যেমন সিগারেট কেনা, মুদির দোকানের কিছু খাবার কম কিনে। অস্বাস্থ্যকর খাবার কম খাওয়ার কারনে অনেক মানুষের অসুখ ও আগের চেয়ে অনেক কম হয়। নির্দিষ্ট ইনকামের শহরের মানুষ কিছুটা মিতব্যায়ি হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস তাকে কিনতেই হয় এবং অন্য খাতের বাঁচানও টাকাটা তার স্বাভাবিক নিত্য প্রয়োজনীয় বাজার সদাই করতে খরচ হয়। এই ক্ষেত্রে শহরের রেস্টুরেন্ট এবং অন্য মুদির দোকানেরও বিক্রি খুব একটা কমে না কারন মানুষ নানা কারনে এখন শহর মুখী। তাই শহরে আরও নতুন রেস্টুরেন্ট এবং মুদির দোকানের বিজনেস বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাংলাদেশের শিক্ষা নিয়ে বিজনেস একটি বড় সমস্যা। সরকার চায় শিক্ষকরা টিউসন না করিয়ে স্কুলেই যেন সব শিখিয়ে দেয় কিন্তু শিক্ষা নিয়ে বিজনেস যেন আরও বেশি গতিতে বেরেই যায়। মুদ্রাস্ফীতি এখানে একটি আশীর্বাদ হয়ে আসে। মুদ্রাস্ফীতি হওয়ার কারনে অনেক পরিবারের হাতে দামি দামি টিউসন পড়ান অথবা সকল বিষয়ে টিউসন পড়ান সম্ভব হয় না। সরকারও এমন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করে যেন শিক্ষার্থীদের টিউসন পরতে না হয়।
মুদ্রাস্ফীতি ব্যাংক খাতের সঞ্চয়ের/জমা খাতে অপর ভাল একটি প্রভাব বিস্তার করে। মুদ্রাস্ফীতি যখন হঠাৎ করে বেড়ে যায় তখন সাময়িক ভাবে কিছু মানুষ সঞ্চয় ভাঙ্গে কিন্তু এটা খুবই সাময়িক। তাছারা এই সময় খুব বেশি মানুষ সঞ্চয়ে হাত দেয় না। মুদ্রাস্ফীতি এর সময় জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি ইত্যাদি জিনিসের দাম বেড়ে যায়। যারা এই সম্পদগুলো কেনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তারা দাম বাড়ার কারনে সম্পদগুলো আর কিনেন না। এই ক্ষেত্রে ব্যাংক ডিপজিট বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। কিন্তু জমি, ফ্ল্যাট, অথবা গাড়ি বেচা কেনা কমে না কারন বাংলাদেশে নানা কারনে বিত্তশালী জনগনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মুদ্রাস্ফীতির কারনে মানুষ বিনোদনের জন্য দূর দুরান্তে ঘুরতে কম যায়। যারা ঘুরতে বের হয় তারা চেষ্টা করে ঘরের কাছেই কোথাও ঘুরে আসতে। এতে করে লোকাল ট্যুরিজম বৃদ্ধি পায়। লোকাল বিজনেসও আগের চেয়ে চাঙ্গা হয়ে উঠে। আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মীয় সজনের বাসায় যাওয়ারও চেষ্টা করে থাকে তাতে সামাজিক বন্ধনও দৃঢ় হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশের মুদ্রাস্ফীতি এর প্রধান কারন তেলের দাম বৃদ্ধি হলেও আরও একটি বড় কারন বৈদেশিক রিজার্ভ কমে যাওয়ার কারনে বিভিন্ন জিনিসের আমদানি ট্যাক্স বৃদ্ধি করা। যে পণ্য উতপাদনের সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে কিন্তু সেই পণ্য বাংলাদেশ উৎপাদন করে না এমন পণ্য এর ট্যাক্স বৃদ্ধি পেলে দেশিয় উৎপাদন অনেক বৃদ্ধি পাবে। যেমন প্রানির মধ্যে গরু উৎপাদন বেড়েছে, বাংলাদেশে সিমেন্ট উৎপাদন হয়, গাড়ির কারখানা এখন বাংলাদেশে হচ্ছে, মোবাইল, ল্যাপটপ কারখানা বাংলাদেশে হচ্ছে। যে খনিজ সম্পদ বাংলাদেশে পাওয়া যায় না এমন জিনিস ছাড়া সকল জিনিসের উৎপাদন বাংলাদেশে শুরু হয়ে যাবে। উৎপাদন খরচ বেশি হলেও মুদ্রাস্ফীতি এখানে উৎপাদনে সহযোগিতা করবে।
মুদ্রাস্ফীতি কখনই সব দেশের জন্য সমানভাবে আশীর্বাদ নিয়ে আসে না। যেমন শ্রীলংকা, পাকিস্থান, আর্জেন্টিনা এর মত কিছু দেশে মুদ্রাস্ফীতির কারনে দেশ অচল হয়ে গিয়েছে প্রায়। শ্রীলংকা অচল হয়েছে কৃষিতে সময়মত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে নাই। পাকিস্থান অচল হয়েছে রাজনৈতিক ভারসাম্য হারানোর কারনে,আর্জেন্টিনা অচল হয়েছে অতিরিক্ত ঋণের বোঝা মাথায় নেওয়ার কারনে কিন্তু প্রচুর মুদ্রাস্ফীতির পরও আমেরিকা, ইউরোপের কিছু দেশ এবং বাংলাদেশে সঠিক কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারনে এখনও অনেক শক্তিশালী অবস্থানে আছে। বিভিন্ন ইনডিকেটর গুলো ভবিষ্যতের অর্থনীতিরও ভাল খবরই দিচ্ছে।
অনলাইন ট্রেডিং সম্পর্কে জানতে চাইলে নিচের লিঙ্কে গিয়ে দেখতে পারেন।
Comments
Post a Comment